প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সচিবদের নিয়ে গতকাল একটি বিশেষ বৈঠক করেছেন। বৈঠকে জ্বালানি সংকট সমাধানে গৃহীত পদক্ষেপগুলো দ্রুত কার্যকর করাসহ আরও নতুন উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।
গতকাল বিকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে নিজের সভাপতিত্বে এ বৈঠকে গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক তেল সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে সৃষ্ট সংকট থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়- সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠকে- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ ও জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, বৈঠকের আলোচনায় এলপিজি আমদানি তথা দীর্ঘমেয়াদি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করা এবং নতুন গ্যাস কূপ খননসহ অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে ঘাটতির কারণে সৃষ্ট বিদ্যুৎ সংকট পর্যায়ক্রমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপসমূহের অগ্রগতিসহ সোলার ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে আরও অধিক পরিমাণে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযোগ করা যায় সেসব বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি সর্বস্তরে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কীভাবে আরও সাশ্রয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়; বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে সরকারি অফিস ও দপ্তরে এসির তাপমাত্রা নির্দিষ্ট রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বাতি জ্বালানো থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে কি না সেসব বিষয়ও বৈঠকের পর্যালোচনায় স্থান পায়।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণ জ্বালানি আমদানিতে সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতও দ্রুত কমছে। এই অবস্থায় সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে নিজস্ব খনি থেকে কয়লা উৎপাদনের ওপর জোর দিচ্ছে। জ্বালানি সংকটের এই ঘোরতর সময়ে জ্বালানি হিসেবে কয়লার ওপর কিছুটা ভরসা রাখতে চাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রমতে, ফুলবাড়িতে স্থানীয়রা রাজি হলেই শুরু হবে কয়লা উত্তোলনের কাজ। আর বড়পুকুরিয়ায় নতুন করে ৩০০ একর জায়গায় কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হয়েছে। জয়পুরহাটের জামালগঞ্জেও আছে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ফুলবাড়ির কয়লা উত্তোলন বিষয়ে বিস্তাারিত জানিয়েছেন। তিনি জানান, স্থানীয়দের আয় রোজগার, বসতি ও পরিবেশের বিষয়টি মাথায় রেখে এবং তা সমাধান করেই এ খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনসুন্ধান কার্যক্রমে অংশ নিতে বাংলাদেশের ডাকা আন্তর্জাতিক দরপত্রে এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বেশ ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। এই জ্বালানি অনুসন্ধান কার্যক্রমে অংশ নিতে এখন পর্যন্ত মোট ১০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান দরপত্র ও তথ্য প্যাকেজ কিনেছে। আগামী ৩০ নভেম্বর এই দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়। তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা- আগামী দুই মাসে আরও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই দরপত্রে অংশ নেবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে স্থলভাগের ১৫০টি গ্যাস কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ৩২টি কূপের ড্রিলিং ও ওয়ার্কওভার কাজ শেষ হয়েছে। তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) কাছ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যে, এই ৩২ কূপের মধ্যে ১৬টির ড্রিলিং (অনুসন্ধান ও উন্নয়ন) কাজ শেষ হয়েছে। আর ওয়ার্কওভার কাজ শেষ হয়েছে আরও ১৬টির। খনন শেষে এই কূপগুলো থেকে ২৮৫ দশমিক ৮ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরবিদ্যুতের ওপর বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, জ্বালানি সংকট সমাধানে এই মুহূর্তে সোলার রুপটপ স্থাপন করাই হচ্ছে সবচেয়ে দ্রুত সমাধান। এর অংশ হিসেবে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসভবন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ ভবন, সরকারি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও হাটবাজারে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন শুরু হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বড় বড় শিল্প কারখানাগুলোতেও স্থাপন করা হচ্ছে সৌর প্যানেল। এমনকি গ্রাহকের বাড়ির সৌর প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎও বিক্রির সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। মানসম্মত সৌর বিদ্যুৎ যন্ত্রাংশ আমদানিতে করা হচ্ছে নীতিমালা। সব মিলে বর্তমান সরকারের মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের পালে ব্যাপক হাওয়া লেগেছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য চারটি দেশের সঙ্গে আটটি চুক্তি আছে বাংলাদেশের। এসব চুক্তির আওতায় এ বছর মোট ১০৩টি এলএনজি কার্গো (জাহাজ) আসার কথা। প্রথম নয় মাসে এসেছে মাত্র ২১টি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে চুক্তির অধিকাংশ কার্গো আসেনি। বাধ্য হয়ে খোলাবাজার (স্পট) থেকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। এই অবস্থায় সরবরাহ ধরে রাখতে এলএনজির উৎস বাড়াচ্ছে সরকার।
যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণে গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকা মহানগরের যানজট নিরসনে অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়ক (ইনার সার্কুলার রিং রোড) নির্মাণকাজের অগ্রগতি পর্যালোচনায় সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন। গতকাল বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সভায় প্রধানমন্ত্রী সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগকে সমন্বিতভাবে প্রকল্পের বিদ্যমান পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে নির্মাণকাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে দ্রুত তা দূর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং কাজ শেষ করতে একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্পের কাজে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেন। সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনারের : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক। গতকাল বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক বিষয়াদি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়। সাক্ষাতে দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বহুমাত্রিক করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, অভিবাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা চলমান রাখা এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করা হয়। সাক্ষাৎকালে তারা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়া এবং পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
