ঢাকা শহরে হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা বাস্তবায়নের বর্তমান পদ্ধতি অপরিকল্পিত ও অপরিণামদর্শী হলে তা হকার সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
সংস্থাটির মতে, সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা করা হলেও পরিকল্পনাহীনভাবে ফুটপাত ও সড়কে হকারদের বসার সুযোগ করে দেওয়া নাগরিক চলাচলে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করছে।এতে ঢাকা শহরের পথচারীদের নিরাপদ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনজীবনে আরও দুর্ভোগ বাড়তে পারে।
আইপিডি বলছে, হকার সমস্যা শুধু ঢাকার নয়; দেশের বিভিন্ন নগর এলাকাতেই এই সমস্যা বিদ্যমান। তাই সমাধানের জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য এবং কমিউনিটি পর্যায়ের নজরদারিও প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।
নীতিমালার সমালোচনা করে আইপিডি জানায়, দেরিতে হলেও নীতিমালা প্রণয়ন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ, তবে এতে নাগরিকদের নিরাপদ চলাচলের অধিকার কার্যত সংকুচিত হয়েছে। ফুটপাত ও সড়কে হকার বসানোর যে কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তা নগর পরিকল্পনার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও তারা দাবি করে।
সংস্থাটি আরো বলেছে, নীতিমালায় ফুটপাতের ন্যূনতম ৫-৬ ফুট জায়গা রাখার বিষয়টি মেগাসিটির জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, বড় শহরের আবাসিক এলাকায় ৮-১০ ফুট, বাণিজ্যিক এলাকায় ১০-১৬ ফুট এবং কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় ২০-৪০ ফুট ফুটপাত প্রয়োজন।কিন্তু বর্তমান নীতিমালায় এসব দিক যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
আইপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মেট্রো স্টেশন, বাসস্টপ বা গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের কাছাকাছি মাত্র ৩০-৪০ ফুট দূরত্বে হকার বসার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাধারণত এসব এলাকায় ১৫০ ফুটের মধ্যে হকার রাখা হয় না।
তবে নীতিমালার কিছু ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। যেমন—হলিডে মার্কেট, নৈশকালীন মার্কেট ও হকারমুক্ত এলাকা ঘোষণার বিষয়টি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।পাশাপাশি প্রান্তিক হকারদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার প্রস্তাবকেও স্বাগত জানিয়েছে আইপিডি।
তবে হকার নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা না থাকা, এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রকাশ না করা এবং হকার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নাগরিক প্রতিনিধিত্ব না রাখাকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে সংস্থাটি।
আইপিডির মতে, ফুটপাত দখলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিলে তা জনদুর্ভোগ আরও বাড়াবে এবং একটি ‘বিপজ্জনক প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্তে’ পরিণত হতে পারে।
সংস্থাটি আরো বলেছে, ঢাকার ফুটপাত ও সড়কে হকার বসানোকে দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনার একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। প্রকৃত দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা ও কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাড়ানো উচিত।
সবশেষে আইপিডি দাবি করেছে, হকার সিন্ডিকেট, লাইনম্যান, রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং চাঁদাবাজ চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। এ জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
